তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: একজন সাধারণ গৃহশিক্ষক বা ‘লজিং মাস্টার’, যিনি এক সময় বাইসাইকেলে চড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করাতেন। ভাগ্যের চাকা বদলে আজ তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) ক্যাশিয়ারের পদকে পুঁজি করে দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বক্তারপুর (নয়াগাঁও) গ্রামের মৃত শওকত আলীর ছেলে আব্দুল হামিদ বর্তমানে সিলেট নগরীর ঘাসিটুলায় বসবাস করছেন। অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, চেক জালিয়াতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সময় থেকেই আব্দুল হামিদের দুর্নীতির রাজত্ব শুরু হয়। তৎকালীন মেয়রের স্বাক্ষর জাল করে চেক বইয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে আনোয়ারুজ্জামানের শাসনামলেও তার এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সিসিকের প্রায় প্রতিটি লেনদেন তার হাত দিয়ে হওয়ায় অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি জনগনের ট্যাক্সের টাকা লুটপাট করেছেন বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট মহলে চাউর আছে যে, আব্দুল হামিদ নিজেই দম্ভ করে বলতেন, “প্রতিদিন ৫-৬ লাখ টাকা পকেটে না ঢুকলে তার ঘুম হয় না।” এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তার পৈতৃক কোনো সম্পদ না থাকলেও বর্তমানে তিনি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক।
সম্প্রতি আব্দুল হামিদ তার নিজ এলাকায় প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদ ও মাদ্রাসার কাজ করাচ্ছেন। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, যে ব্যক্তি তিল তিল করে দুর্নীতির পাহাড় গড়েছেন, তার এই ‘দানবীর’ ইমেজ কি স্রেফ অবৈধ টাকা সাদা করার বা নাম কামানোর কৌশল? স্থানীয়দের দাবি, আল্লাহর ঘরে হালাল টাকা দান করা হয়, কিন্তু একজন চিহ্নিত ঘুষখোর ও টেন্ডারবাজের ‘হারাম’ উপার্জনের টাকা দিয়ে মসজিদ নির্মাণ ধর্মীয় অবমাননার সামিল।
দুর্নীতির পাশাপাশি আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও পাহাড়সমান। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের বাসিন্দা মোঃ আবুল মিয়াকে এলাকা ছাড়া করা, প্রাণনাশের হুমকি এবং প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে গুম করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রাণভয়ে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ভুক্তভোগী আবুল মিয়াকে।
বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে সিলেটবাসীর দাবি—অবিলম্বে আব্দুল হামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তদন্ত করা হোক। চেক জালিয়াতি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে লুট করা জনসাধারণের প্রতিটি টাকা উদ্ধার করে তাকে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
এক আব্দুল হামিদকে শাস্তির মুখোমুখি করা না গেলে সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা আরও শত শত দুর্নীতিবাজ উৎসাহিত হবে। তদন্ত শুরু হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply